প্রথম পাতা

ক্যাগ রিপোর্ট ফাঁস ত্রিপুরার গ্রামীণ উন্নয়নের অন্দরমহল

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করা যতটা সহজ, সেই প্রকল্পের অর্থ সময়মতো কাজে লাগানো ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্যাগ রিপোর্ট দেখিয়ে দিচ্ছে যে ত্রিপুরার প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ক্যাগ রিপোর্ট কোনো বিরোধী দলের প্রচারপত্র নয়, এটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক নিরীক্ষা সংস্থার সরকারি নথি।

Pratibadi Kalam Newsroom3 মিনিট পড়া
ক্যাগ রিপোর্ট ফাঁস ত্রিপুরার গ্রামীণ উন্নয়নের অন্দরমহল

ক্যাগ রিপোর্টে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে ! ১,৮৩৫ কোটি টাকারও বেশি তহবিল ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ত্রিপুরার গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থ দপ্তর। উন্নয়নের ঢাকঢোল, বিজ্ঞাপনের ঝলকানি আর সরকারি সাফল্যের প্রচারের আড়ালে যে এক ভিন্ন বাস্তবতা লুকিয়ে রয়েছে, তারই এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষক (CAG)-এর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট। ক্যাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদিত বিপুল পরিমাণ তহবিল নির্ধারিত সময়ে Single Nodal Agency (SNA) অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়নি।

এই সময়কালে মোট প্রায় ₹১,৮৩৫ কোটিরও বেশি তহবিল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল, অথচ সেই অর্থ ছাড় এবং জমা প্রদানের ক্ষেত্রে বারবার বিলম্বের ঘটনা ধরা পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এই বিলম্বের জন্য দায়ী কে ? ত্রিপুরা সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তর, অর্থ দপ্তর, নাকি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তারা ? জনগণের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ যদি সময়মতো প্রকল্পের অ্যাকাউন্টে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় দাবি কি শুধুই কাগুজে প্রচার ? ক্যাগ রিপোর্ট বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে একাধিক কিস্তিতে কেন্দ্রীয় তহবিল অনুমোদিত হয়। ₹৫৩৩.২৪ লক্ষ, ₹৬৪৩.২১ লক্ষ, ₹১৯৬.১৫ লক্ষ এবং ₹৩৫৯.৯৮ লক্ষসহ বিভিন্ন বরাদ্দ SNA অ্যাকাউন্টে জমা হতে ২ দিন থেকে ২১ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।

একইভাবে রাজ্যের অংশ হিসেবেও অর্থ জমা দিতে সমপরিমাণ বিলম্ব হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক শৈথিল্য তখনই শুরু হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। ₹৬,৩৭৮.০৮ লক্ষ এবং ₹৫০৭.৫০ লক্ষের মতো বড় অঙ্কের তহবিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও ৯ দিন পর্যন্ত বিলম্ব ধরা পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ সময়মতো মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা আটকে থেকেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই বছর ₹৩,৬৬১.৪৫ লক্ষ কেন্দ্রীয় তহবিল SNA অ্যাকাউন্টে পৌঁছাতে ২৭ দিন বিলম্ব হয়েছে। ক্যাগের রিপোর্টে উল্লেখিত এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক স্পষ্ট দলিল।

যখন গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা, ড্রেন, জল সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার কথা, তখন কোটি কোটি টাকা কার্যত ফাইলে আটকে ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একই প্রবণতা অব্যাহত থেকেছে। ₹৬,৯৪৬.১৭ লক্ষ কেন্দ্রীয় অংশ এবং ₹২,৩১৫.৫৬ লক্ষ রাজ্য অংশ SNA অ্যাকাউন্টে জমা হতে ৪ দিন বিলম্ব হয়েছে। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন—৪ দিন হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু যখন এই বিলম্ব ধারাবাহিকভাবে বছরের পর বছর ঘটে, তখন তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব মানে শুধু হিসাবের গরমিল নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, শ্রমিকদের মজুরি, নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং স্থানীয় অর্থনীতির উপর।

বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক এবং ছোট ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ক্যাগ যখন এই অনিয়ম ও বিলম্ব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ? কেন এখনো কোনো জবাবদিহিতার খবর সামনে আসেনি? কেন জনগণকে জানানো হয়নি এই বিলম্বের জন্য কোন স্তরে দায়িত্বহীনতা ছিল ? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করা যতটা সহজ, সেই প্রকল্পের অর্থ সময়মতো কাজে লাগানো ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্যাগ রিপোর্ট দেখিয়ে দিচ্ছে যে ত্রিপুরার প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ক্যাগ রিপোর্ট কোনো বিরোধী দলের প্রচারপত্র নয়, এটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক নিরীক্ষা সংস্থার সরকারি নথি।

সেই নথিই যখন বলছে যে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তহবিল প্রকল্পের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে বারবার বিলম্ব হয়েছে, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে বাস্তবতাকে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু ক্যাগের পর্যবেক্ষণকে মুছে ফেলা যায় না। এখন রাজ্যের মানুষের প্রশ্ন একটাই—গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ যদি সময়মতো প্রকল্পে না পৌঁছায়, তাহলে উন্নয়নের দাবির ভিত্তি কোথায় ? জবাব দিতে হবে গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তরকে, জবাব দিতে হবে অর্থ দপ্তরকে, জবাব দিতে হবে সরকারের সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে, যার গাফিলতির খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।

ক্যাগ রিপোর্ট ফাঁস ত্রিপুরার গ্রামীণ উন্নয়নের অন্দরমহল |... | Pratibadi Kalam