প্রথম পাতা

গ্রাহকের বিদ্যুৎ কিনে কম দামে, বিক্রি করে বহু গুণ বেশি—কাঠগড়ায় TSECL

সৌর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রশ্ন, একই বিদ্যুৎ TSECL থেকে কিনতে গেলে এক ধরনের মূল্য, আর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেই বিদ্যুৎ TSECL কর্তৃপক্ষ কিনলে অন্য মূল্য—এই দ্বৈত নীতি কোন যুক্তিতে ?

Pratibadi Kalam Newsroom3 মিনিট পড়া
গ্রাহকের বিদ্যুৎ কিনে কম দামে, বিক্রি করে বহু গুণ বেশি—কাঠগড়ায় TSECL

একদিকে রাজ্য সরকার ও ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেড (TSECL) ঘরে ঘরে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের আহ্বান জানাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাধারণ মানুষকে অংশীদার করার নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনকারী বহু গ্রাহকের অভিযোগ—নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য মূল্য থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে "সবুজ শক্তি"র নামে লাভের প্রতিশ্রুতি এখন অনেকের কাছে আর্থিক বৈষম্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা বাড়ির ছাদে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পর অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ TSECL-এর গ্রিডে সরবরাহ করেন। কিন্তু সেই বিদ্যুতের বিনিময়ে যে অর্থ পাওয়ার কথা, সেখানে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে তাদের বক্তব্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম ১০০ ইউনিট অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্য কোনও অর্থই দেওয়া হয় না TSECL কর্তৃপক্ষ। এরপর অতিরিক্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য মাত্র ৫ টাকা নির্দিষ্ট হারে প্রদান করা হয়। অথচ একই সময়ে TSECL সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বেশি হারে অর্থ আদায় করে। বর্তমানে প্রথম ৫০ ইউনিটের জন্য ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৫৩ পয়সা, এরপর ৫১-১৫০, ১৫১-৩০০ এবং ৩০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও উচ্চ হারে চার্জ নেওয়া হচ্ছে। এর থেকে বাদ যাচ্ছেন না সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীও। এই পরিস্থিতিতে সৌর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রশ্ন, একই বিদ্যুৎ TSECL থেকে কিনতে গেলে এক ধরনের মূল্য, আর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেই বিদ্যুৎ TSECL কর্তৃপক্ষ কিনলে অন্য মূল্য—এই দ্বৈত নীতি কোন যুক্তিতে ?

শুধু তাই নয়, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে একজন সাধারণ গ্রাহককে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে বা বহু বছরের সঞ্চয় খরচ করে এই ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করে ধীরে ধীরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে। কিন্তু বর্তমান অর্থপ্রদানের কাঠামো সেই প্রত্যাশাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে অভিযোগ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হলে "প্রোসিউমার" (যিনি উৎপাদন ও ব্যবহার—দুই-ই করেন) ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা জরুরি। যদি উৎপাদক গ্রাহকরা ন্যায্য অর্থ না পান, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন কেউ সৌর বিদ্যুতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের লক্ষ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিল আদায়ের ক্ষেত্রে TSECL কর্তৃপক্ষ কোনও ধরনের ছাড় দেয় না। বিল জমা দিতে দেরি হলে জরিমানা ধার্য করা হয়, কিন্তু গ্রাহকের উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে একই ধরনের স্বচ্ছতা বা সমতা দেখা যায় না। ফলে অনেকেই মনে করছেন, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই বিষয়টি নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, নেট মিটারিং ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কি গ্রাহককে উৎসাহিত করা, নাকি নিরুৎসাহিত করা ? যদি একজন গ্রাহক নিজের অর্থ ব্যয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন এবং সেই বিদ্যুৎ সরকারি গ্রিডে যোগ করেন, তাহলে তার জন্য স্বচ্ছ ও ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ কি হওয়া উচিত নয় ? এদিকে শক্তি নীতি নিয়ে কাজ করা মহলের মতে, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে হলে বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য, নেট মিটারিং নীতি এবং বিল নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করতে হবে। তা না হলে সরকারের সবুজ জ্বালানি প্রসারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের দাবি, প্রথম ১০০ ইউনিটের অর্থ না দেওয়ার নীতি এবং পরবর্তী বিদ্যুতের জন্য নির্দিষ্ট কম হারে অর্থপ্রদানের বিষয়টি সরাসরি গ্রাহক ঠকানোর সামিল। পাশাপাশি TSECL কী নীতির ভিত্তিতে এই মূল্য নির্ধারণ করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশনের অনুমোদিত বিধি অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণে কোনও বৈষম্য থাকলে সেটিও পর্যালোচনার দাবি উঠেছে ঐ সকল সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের তরফে। সৌর বিদ্যুতের নামে যদি সাধারণ মানুষকে লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়, অথচ উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য মূল্য না মেলে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই প্রকল্প কি সত্যিই সবুজ শক্তির প্রসার, নাকি গ্রাহকের একতরফা আর্থিক বোঝা ? এখন সময় এসেছে TSECL এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়ার। কারণ, যে গ্রাহক নিজের অর্থ ব্যয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করছেন, তাঁর ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে যদি বিতর্ক তৈরি হয়, তবে সৌর বিদ্যুতের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার ও বিদ্যুৎ নিগমের উচিত এই অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে মূল্য নির্ধারণ নীতির পুনর্বিবেচনা করা, যাতে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের লক্ষ্য এবং গ্রাহকের ন্যায্য স্বার্থ—দুই-ই সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে।

গ্রাহকের বিদ্যুৎ কিনে কম দামে, বিক্রি করে বহু গুণ... | Pratibadi Kalam