ক্যাগ রিপোর্টে বিস্ফোরক ইঙ্গিত! হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, অথচ আয় নগণ্য — কার স্বার্থে চলছে সরকারি অর্থের এই খেলা ?
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এত বিপুল মূলধন বিনিয়োগের বিপরীতে এত সামান্য আয় কার্যত আর্থিক দক্ষতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়

ত্রিপুরার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সদ্য প্রকাশিত ক্যাগ রিপোর্ট। সরকারি হিসাবের পাতায় উন্নয়নের রঙিন ছবি আঁকার চেষ্টা চললেও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য যেন সেই ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে নগ্ন করে দিয়েছে। কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ, বিপুল আর্থিক লেনদেন, অথচ তার বিপরীতে নগণ্য আয়—এই চিত্র কি সুশাসনের প্রতীক, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক ভয়াবহ দলিল ? ক্যাগ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে অ-আর্থিক পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস (PSU)-এ সরকারের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২,০৪১.১৫ কোটি টাকা। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এই বিপুল বিনিয়োগ থেকে সরকার লভ্যাংশ পেয়েছে মাত্র ৬.৩৩ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের মাত্র ০.৩১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এত বিপুল মূলধন বিনিয়োগের বিপরীতে এত সামান্য আয় কার্যত আর্থিক দক্ষতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়। প্রশ্ন উঠছে, এই হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছে কে ? অর্থ দপ্তর কি নিয়মিতভাবে বিনিয়োগের ফলাফল পর্যালোচনা করেছে ? সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলো কি লোকসানি সংস্থাগুলিকে পুনর্গঠনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে ? নাকি বছরের পর বছর ধরে জনগণের করের টাকা এমন খাতেই ঢালা হয়েছে, যেখানে লাভের বদলে ক্ষতির পাহাড় জমেছে ? ক্যাগ রিপোর্ট আরও উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান হিসাব পদ্ধতিতে ভূমি, ভবনসহ বহু সরকারি সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। অর্থাৎ সরকারের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ কত, সেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য কত, অথবা সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর সরকারি হিসাবেই অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু হিসাবরক্ষণগত দুর্বলতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আরও উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো রিজার্ভ ব্যাংকে সরকারের নগদ অবস্থার চিত্র। ক্যাগের তথ্য অনুযায়ী, নগদ ব্যালেন্সের ওঠানামা এবং বিপুল অঙ্কের ট্রেজারি বিল ক্রয়-বিক্রয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪,৬৮৬ কোটি টাকার ট্রেজারি বিল ক্রয় এবং ৪৩,৯১৪ কোটি টাকার বিক্রয় হয়েছে। এত বিপুল অঙ্কের লেনদেনের পরও রাজ্যের আর্থিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি কোথায়—এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষেরও। পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানে শুধু অর্থ দপ্তর নয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ, পাবলিক সেক্টর সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ—সকলকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ জনগণের করের টাকা কোনো দপ্তরের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রশাসনিক মহলে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—যে সব সরকারি সংস্থা বছরের পর বছর পর্যাপ্ত মুনাফা দিতে ব্যর্থ, সেগুলোর কর্মদক্ষতা নিরীক্ষা কেন হচ্ছে না ? লোকসানি সংস্থাগুলোর দায় কার ? সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষকর্তারা কি কখনও জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন ? নাকি ব্যর্থতার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করছে রাজ্যের সাধারণ মানুষ ? জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, রাজ্যের সব PSU-র আর্থিক স্বাস্থ্য, বিনিয়োগের ফলাফল, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের বিশেষ নিরীক্ষা অবিলম্বে শুরু করা হোক। একই সঙ্গে গত এক দশকে সরকারি বিনিয়োগের প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কেও শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি উঠেছে। ক্যাগ রিপোর্ট কোনো আদালতের রায় নয়, কিন্তু এটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ। সেই পর্যবেক্ষণকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ক্যাগের রিপোর্ট বারবার প্রমাণ করেছে যে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিকল্পনার ব্যর্থতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার অসঙ্গতি শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্যাগ রিপোর্ট রাজ্যের আর্থিক প্রশাসনের সামনে এক কঠিন আয়না তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে নগণ্য আয়, সম্পদের অস্পষ্ট মূল্যায়ন, প্রশ্নবিদ্ধ আর্থিক দক্ষতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেবে, নাকি সবকিছু আবারও ফাইলের স্তূপে চাপা পড়বে ? জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা ব্যবস্থায় ব্যর্থতার কোনো অজুহাত নেই। কারণ হিসাবের খাতায় সংখ্যা লুকিয়ে রাখা গেলেও জনগণের আদালতে একদিন না একদিন প্রতিটি টাকার জবাব দিতেই হবে।