প্রথম পাতা

রেগায় গড়ে মাত্র ৯ দিনের কাজ: ত্রিপুরার গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

রেগা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলিকে বছরে ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করা। অথচ অর্থবর্ষের দুই মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি গড় কর্মদিবস মাত্র ৯ দিনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই তথ্য অনেকের মতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

Pratibadi Kalam Newsroom3 মিনিট পড়া
রেগায় গড়ে মাত্র ৯ দিনের কাজ: ত্রিপুরার গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

কী ঘটেছে?

মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প (রেগা) রাজ্যের গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থানের ভরসা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান সামনে আসার পর ত্রিপুরায় এই প্রকল্পের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের ৯ জুন পর্যন্ত রাজ্যে ৩,৩৪,৯৫৭ জন শ্রমিক রেগার আওতায় কাজ পেলেও মোট শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৩১,২৭,৬১১। ফলে গড়ে একজন শ্রমিকের ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ৯ দিনের কাজ।

কেন এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ?

রেগা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলিকে বছরে ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করা। অথচ অর্থবর্ষের দুই মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি গড় কর্মদিবস মাত্র ৯ দিনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই তথ্য অনেকের মতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

গ্রামের মানুষের ওপর এর প্রভাব কী?

গ্রামীণ এলাকার বহু মানুষের কাছে রেগা শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রকল্প নয়, বরং জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কৃষিকাজ বন্ধ থাকলে, বাজারে কাজের সুযোগ কমে গেলে বা মৌসুমি কর্মসংস্থান না থাকলে হাজার হাজার পরিবার এই প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বহু শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে শ্রমশক্তির বহির্গমনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা?

রেগার অধীনে কাজ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতির উপর। গ্রামের চায়ের দোকান, মুদি দোকান, কৃষি উপকরণের ব্যবসা, পরিবহণ পরিষেবা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা মূলত স্থানীয় মানুষের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। যখন শ্রমিকদের হাতে পর্যাপ্ত কাজ থাকে না, তখন তাদের আয়ও কমে যায়। আয় কমলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, আর তার প্রভাব পড়ে পুরো গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থার উপর। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন?

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেগা কেবল মজুরি প্রদানের একটি প্রকল্প নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থ প্রবাহ বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রমিকদের হাতে অর্থ পৌঁছালে সেই অর্থ স্থানীয় বাজারে খরচ হয় এবং একটি অর্থনৈতিক চক্র সক্রিয় থাকে। ফলে কর্মদিবস কমে গেলে তার প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহণ খাত এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাজের সুযোগের অভাব নাকি পরিকল্পনার ঘাটতি?

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এখনও পানীয় জল প্রকল্প, গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন, জল সংরক্ষণ, পুকুর সংস্কার এবং মাটির কাজের মতো বহু প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, যখন সম্ভাব্য কাজের অভাব নেই, তখন শ্রমদিবস সৃষ্টি এত কম কেন? প্রশাসনিক অদক্ষতা, পরিকল্পনার ঘাটতি নাকি প্রকল্প বাস্তবায়নে শৈথিল্য—এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কোথায় তৈরি হচ্ছে বাধা?

বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ, প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, কাজের পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ধীরগতি এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক জায়গায় শ্রমিকরা কাজ চাইলেও সময়মতো কাজ পাচ্ছেন না। কোথাও প্রকল্প শুরু হচ্ছে না, আবার কোথাও অনুমোদন সংক্রান্ত জটিলতায় কাজ আটকে রয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ।

মূল্যবৃদ্ধির সময়ে সংকট আরও গভীর

এই কর্মসংস্থান সংকট এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, ওষুধ এবং শিক্ষার খরচ বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ পরিবারের উপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আয় কমে গেলে তাদের জীবনযাত্রার মান আরও চাপে পড়ে।

সামনে কোন প্রশ্নগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রেগা কি বাস্তবে গ্রামীণ মানুষের হাতে পর্যাপ্ত কাজ পৌঁছে দিতে পারছে? ৩,৩৪,৯৫৭ শ্রমিকের জন্য গড়ে মাত্র ৯ দিনের কাজ প্রকল্পের লক্ষ্য এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বছরের বাকি সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মূল উদ্বেগ কোথায়?

গ্রামীণ কর্মসংস্থান, ক্রয়ক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং জীবিকার নিরাপত্তা—সবকিছুই এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অনেকের মতে, ত্রিপুরার গ্রামীণ অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী মাসগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কতটা বৃদ্ধি পায় এবং রেগা প্রকল্প তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণের পথে কতদূর এগোতে পারে।