প্রথম পাতা

বিধায়কের কারণে বাড়তি নিরাপত্তা চাইলেন এসডিএম!

খবর নিয়ে জানা গেছে, অফিসটিলায় এমপিএলএডি প্রকল্পের একটি সুইমিং পুলের কাজ বের হয়৷ কিন্তু যে পুকুরটিতে সুইমিং পুল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেই পুকুরের একটি অংশ মালিকানাধীন, অপর অংশ খাস জমি হিসেবে চিহ্ণিত ৷

Pratibadi Kalam Newsroom4 মিনিট পড়া
বিধায়কের কারণে বাড়তি নিরাপত্তা চাইলেন এসডিএম!

আগরতলা, ৩০ জুন৷৷ ত্রিপুরা বিধানসভার প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছর পূর্তির দিনেই সামনে এল এমন এক অভিযোগ, যা রাজ্যের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল৷ অভিযোগের কেন্দ্রে একজন ‘নির্বাচিত’ বিধায়ক, আর অভিযোগকারী এক মহকুমা শাসক৷ সরকারি দপ্তরে ঢুকে প্রশাসনিক বৈঠক ভণ্ডুল, সরকারি আধিকারিকদের প্রকাশ্যে অপমান, সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ তুলে জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে নালিশ জানিয়েছেন বিশালগড়ের মহকুমা শাসক বিঙ্কি সাহা৷ নিজের দপ্তরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও দেহরক্ষী মোতায়েনেরও আবেদন করেছেন৷

ঘটনাটি এখন প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জনপ্রতিনিধির আচরণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এই তিন প্রশ্ণ একসঙ্গে রাজ্যের পরিস্থিতির পরিচয় যেন দিচ্ছে! পয়লা জুলাই ত্রিপুরা বিধানসভার প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্‌যাপন হচ্ছে৷ ১৯৬৩ সালে এই বিধানসভার প্রতিষ্ঠা৷ এই সময়ের মধ্যে ত্রিপুরা বিধানসভার কোনও বিধায়ক কোনও মহকুমা শাসকের দপ্তরে দলবল নিয়ে ঢুকে প্রশাসনিক বৈঠক পন্ড করে দিয়ে মহকুমা শাসক সহ অন্যান্য পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে গালাগাল ও অভদ্রজনোচিত কথাবার্তা বলায় অফিসাররা নিরাপত্তহীন বোধ করছেন, এমন ঘটনা প্রথম ঘটলো বিশালগড়ে৷ বিশালগড়ের বিধায়ক সুশান্ত দেবের বিরুদ্ধে জেলাশাসকের কাছে চিঠি লিখে এই অভিযোগ জানিয়েছেন মহকুমা শাসক বিঙ্কি সাহা৷ পুলিশ সুপারকে আলাদা করে চিঠি লিখে মহকুমা শাসকের দপ্তরে নিরাপত্তায় দেহরক্ষী মোতায়েনের কথাও বলেছেন শ্রীমতী সাহা৷ মহকুমা শাসক এই চিঠি জেলাশাসককে লিখেছেন গত ০৮ মে তারিখে৷ এর পর সব চুপচাপ৷

প্রশাসনিকভাবে কোনও ব্যবস্থা বিধায়কের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে বলে কেউ জানেন না, তবে মহকুমা শাসকের দপ্তরে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে আরক্ষা দপ্তর- এমন জানা গেছে ৷ বিঙ্কি সাহা তাঁর চিঠিতে (নং এফ ১০(০৯) এসডিএম/ বিএলজি/ সিওএন/১৭৭০ (১)) লিখেছেন ১৬ নম্বর বিশালগড়ের বিধায়ক জোর করে তাঁর অফিসে ঢুকে অফিসের কাজকর্ম ভণ্ডুল করেছেন এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন৷ ঘটনার বিবরণ দিয়ে মহকুমা শাসক বলেন, সাত মে সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ বিধায়ক সুশান্ত দেব জোর করে তাঁর কক্ষে ঢুকে যান৷ সেই সময় তিনি ভিডিও কনফারেন্সে একটি মিটিং করছিলেন৷ প্রায় ৪০ জন সহযোগী নিয়ে বিধায়কের অফিসে প্রবেশে ভিসি মিটিং পন্ড হয়৷ গোটা অফিস তটস্থ হলে স্বাভাবিক কাজকর্ম ভেস্তে যায়৷ অফিস কক্ষে ঢুকেই বিধায়ক বিশালগড় রেভিনিউ সার্কেলের ডিসিএমকে ডেকে আনার নির্দেশ দেন৷ অন্যান্য অফিসার ও সরকারি কর্মচারীদের সামনেই বিধায়ক ডিসিএম এবং মহকুমা শাসকের সমন্ধে অভদ্রজনোচিত ভাষায় হুমকির সুরে কথা বলতে শুরু করেন৷

তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল কেন ডিসিএম একটি জোতজমিকে তাঁর কথামতো খাসজমি ঘোষণা করছে না, যা সরকারি এমপিএলইডি প্রকল্পের কাজে আসতে পারে? বিধায়ক কোনওরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অপমানজনক এবং অসম্মানজনক ভাষায় ডিসিএমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন৷ যা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি ছিল৷ বিধায়ক এদিন জানতে চেয়েছেন, বিশালগড় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে নার্সারি বিভাগে ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে তাঁর ভোট কেন্দ্রের জন্য কেন ছাত্র ভর্তির স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল বাইপাস করা হবে না? এসডিএম বিধায়ককে অনুরোধ জানান, তাঁর অভিযোগগুলো লিখিত আকারে দেওয়ার জন্য, যাতে প্রশাসনিকভাবে এর বিরুদ্ধে তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া যায়৷ কিন্তু বিধায়ক লিখিত দিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁর মৌখিক আক্রমণ আরও তীব্র করেন৷ তাঁর এই ধরনের আচরণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তাতে অফিসে উপস্থিত সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন পরিষেবাগুলি বন্ধ করে দিতে হয়৷ মানুষের মধ্যে এই পরিস্থিতি ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়৷ মহকুমা শাসক তাঁর চিঠির শেষান্তে এসে বলেছেন, এই পরিবেশ এক ভীতির আবহ তৈরি করেছে৷ জনপ্রতিনিধির এই ধরনের আচরণ একটি সরকারি অফিসের মর্যাদাকে ভূলুন্ঠিত করে৷ অফিসারেরা বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতে বাধাগ্রস্ত৷

এই রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক সংহতি রক্ষায় জেলাশাসক যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন৷ একই তারিখে মহকুমা শাসক আরও একটি চিঠি ( ১০(০৯)/এসডিএম/বিএলজি/ সিওএন/১৭৭০(১) ) লিখেছেন পুলিশ সুপারকে৷ সেই চিঠিতে অফিসে মহকুমা শাসকের জন্য একজন অতিরিক্ত দেহরক্ষী এবং অফিস গেটে একজন সেন্ট্রি চেয়েছেন গোটা ঘটনা জানিয়ে৷ প্রসঙ্গত রাজ্যে কোনও মহকুমা শাসকের দপ্তরে সদলবলে ঢুকে কোনও বিধায়কের এই ধরনের আচরণ এর আগে শোনা যায় নি৷ জমি দস্যুদের আবদার না মানায় সদর মহকুমা শাসক সুকরাম দেববর্মাকে খুন হতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনও বিধায়কের যুক্ত থাকার কথা কেউ কখনো বলে নি৷ এইবার খোদ বিধায়ক অফিসে গিয়ে হুমকি দিয়ে এলেন জোতজমি সরকারি করে দেওয়ার জন্য৷

খবর নিয়ে জানা গেছে, অফিসটিলায় এমপিএলএডি প্রকল্পের একটি সুইমিং পুলের কাজ বের হয়৷ কিন্তু যে পুকুরটিতে সুইমিং পুল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেই পুকুরের একটি অংশ মালিকানাধীন, অপর অংশ খাস জমি হিসেবে চিহ্ণিত ৷ কিন্তু বিধায়ক চাইছেন সবটা পুকুর খাস লিখে দিতে৷ কিন্তু মহকুমা প্রশাসন বেআইনি কাজটি করতে রাজি হয় নি৷ এতেই ক্ষেপে যান বিধায়ক৷ গত কয়েক মাস ধরে বিশালগড়ের মানুষ দেখছেন কিভাবে অস্ত্রের ঝলকানি চলছে এই এলাকায়৷ রাতের আঁধারে ঠিকেদারের বাড়িতে গুলি চালানো হয়েছে৷ মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে৷ কিছুদিন আগে অমরপুরে বিডিওর চেম্বারে ঢুকে একইভাবে রাষ্ট্রবাদীরা হামলা করে৷ বিডিও মামলা করলেও এখনো গ্রেফতার নেই৷ একই হাল বিশালগড়েও৷ টিসিএস সংগঠন প্রতিবাদ করছে না ঘটনাগুলো নিয়ে৷ তারা কি মুখ্যমন্ত্রীর অভয়ে আশ্বস্ত?