৫১,৭৮৪ শূন্যপদ ভিলেজ কমিটির নির্বাচনের আগে বেকায়দায় শাসকদল
অভিযোগ উঠছে, সরকারের ব্যর্থতায় একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগছে পাঁচ থেকে সাত বছর। ফলে চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতী। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও অনেকেই চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, কিছু নিয়োগ আদালতের নির্দেশে বাতিলও হয়েছে।

রাজ্যের বেকারদের সামনে আবারও উঠে এলো চমকে দেওয়া এক পরিসংখ্যান। ত্রিপুরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১,৭৮৪। অথচ নিয়োগের গতি কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—চাকরির প্রতিশ্রুতি কি শুধুই নির্বাচনী স্লোগান ছিল ?
২০২৬ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে মোট শূন্যপদ ৫১,৭৮৪টি। এই বিপুল শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত থমকে রয়েছে।আরও উদ্বেগজনক বিষয়, গত সাত বছরে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে মোট ২৭,২২৭ জন কর্মচারী কমে গেছে। শতাংশের হিসেবে যা ৪০.১২ শতাংশ।২০১৭ সালে রাজ্যে মোট সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১,৫২,৮৩১ জন। কিন্তু সাত বছরে সেই সংখ্যা ক্রমাগত কমে গিয়েছে। অর্থাৎ নিয়োগ তো হয়ইনি, উল্টো কর্মচারীর সংখ্যা কমেছে। ফলে সরকারি পরিষেবার উপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পূর্ত ও স্বরাষ্ট্র দপ্তরে। এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেই রয়েছে ৩২,১৭৮টি শূন্যপদ। অর্থাৎ রাজ্যের মোট শূন্যপদের ৬২ শতাংশ এই চার দপ্তরে। এই পরিসংখ্যানই সরকারি পরিষেবার সংকটের গভীরতা তুলে ধরছে। তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরে শূন্যপদ ৬৭০৬টি। মাধ্যমিক শিক্ষায় ৪০৩২টি। উচ্চশিক্ষায় ১০০৯টি। স্বরাষ্ট্র দপ্তরে (পুলিশ) ৭১১৫টি। টিএসআর-এ ২৪০৫টি। ডাক্তার ১৬৮৮টি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণে ৫৮২০টি। নার্স ৫১১২টি। স্বাস্থ্য কারিগরি কর্মী ১১৯৭টি। পিডব্লিউডি (আরঅ্যান্ডবি)-তে ৩৬০৫টি। কৃষিতে ২০৭৫টি। প্রাণী সম্পদ উন্নয়নে ১৫৩৩টি। গ্রামীণ উন্নয়নে ১১৪১টি। রাজস্বে ১১৩৪টি। ক্রীড়া ও যুব বিষয়কে ৭৬২টি। ফায়ার সার্ভিসে ৭৩৪টি। বন দপ্তরে ৬২৬টি শূন্যপদ রয়েছে।
এছাড়া পিডব্লিউডি (ডব্লিউআর)-এ ৫১৪টি। তপশিলি জাতি ও অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণির কল্যাণে ৪৫৩টি। মৎস্য দপ্তরে ৪৪৪টি। শিল্প ও বাণিজ্যে ৪০৮টি। তথ্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক দপ্তরে ৩৭৪টি।আনোয়ারি সাহায্যকারী ও কর্মীতে ৩৩৬টি। তাঁত, হস্তশিল্প ও রেশম চাষে ২৬৪টি।সমাজকল্যাণ ও শিক্ষা দপ্তরে ২৪৫টি। অর্থ দপ্তরে ২৪০টি। খাদ্য ও বেসামরিক সরবরাহে ২২৮টি। পিডব্লিউডি (ডিডব্লিউএস)-এ ২০৯টি।সাধারণ প্রশাসন (মুদ্রণ)-এ ১৮৯টি। কর্পোরেশনে ১৫৬টি। বিদ্যুতে ১৫৫টি। পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে ৮৩টি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ৭১টি। পর্যটনে ৫১টি। তথ্য প্রযুক্তিতে ৪০টি। কর্ম বিনিয়োগে ৩৩টি। সংখ্যালঘু দপ্তরে ২৩টি। নগর উন্নয়নে ১৮টি। আইন দপ্তরে ১৬টি। পরিবহণে ১০টি। ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ৯টি শূন্যপদ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪২টি দপ্তরে শূন্যপদ ৫১,৭৮৪টি—এই তথ্যই রাজ্যের কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।
অভিযোগ উঠছে, সরকারের ব্যর্থতায় একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগছে পাঁচ থেকে সাত বছর। ফলে চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতী। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও অনেকেই চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, কিছু নিয়োগ আদালতের নির্দেশে বাতিলও হয়েছে। ফলে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে। গত তিন বছরে এডিসিতেও নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে বিজেপির ভিশন ডকুমেন্টে বছরে ৫০ হাজার সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে সাত বছরে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত পদে চাকরি হয়েছে মাত্র ২১ হাজার জনের।
২০১৭ সালে রাজ্যে বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার। সাত বছরে মাত্র ২১ হাজার নিয়োগ হওয়ায় বেকার সমস্যা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অভিযোগ, নিয়োগ না হওয়ায় গত সাত বছরে প্রায় ২৮ হাজার শূন্যপদ অবলুপ্ত হয়ে গেছে।আগামী কয়েক মাসে আরও হাজার হাজার পদ অবলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত সাত বছরে শিক্ষা, পিডব্লিউডি (আরঅ্যান্ডবি), পশু সম্পদ, খাদ্য ও নাগরিক সরবরাহসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মোট ২৭,২২৭ জন কর্মচারী কমেছে। ফলে সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, আসন্ন ত্রিপুরা এডিসি নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ চাকরি ও কর্মসংস্থান এখন মানুষের প্রধান দাবি। রাজ্যে ৫১,৭৮৪ শূন্যপদ। ২১ হাজার নিয়োগ হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার চাকরির। এই হিসাবই যেন শাসকদলের কর্মসংস্থান নীতির বাস্তব চিত্র। চাকরির প্রতিশ্রুতি ছিল পাহাড়সম, বাস্তব নিয়োগ বালুকণার মতো।বেকারদের আশা—সরকারি ফাইলে আটকে। নিয়োগের গতি—বছরে নয়, দশকে মাপা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন— চাকরি কোথায় ? ভিলেজে কমিটির নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নই কি সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠবে ? এর একটাই স্পষ্ট জবাব—শূন্যপদের সংখ্যা শুধু বাড়েনি,শূন্য হয়েছে প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসও যেটা দলবলের নাটকে আটকে রাখা কঠিন হবে আসন্ন ত্রিপুরার ভিলেজ কমিটির নির্বাচনে।